ইমাম, মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের জন্য মাসিক রাষ্ট্রীয় সম্মানী চালু করল সরকার

দেশের বিভিন্ন মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধ বিহার ও গির্জায় কর্মরত ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাসিক রাষ্ট্রীয় সম্মানী প্রদানের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে একটি সমন্বিত নীতিমালা জারি করা হয়েছে, যা সরকারি গেজেটে প্রকাশের দিন থেকেই কার্যকর হয়েছে।

উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিবর্গের কল্যাণে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিশেষ নীতিমালা
উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিবর্গের কল্যাণে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিশেষ নীতিমালা

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, নির্বাচিত ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিরা তাঁদের পদমর্যাদা অনুসারে প্রতি মাসে নির্ধারিত হারে এই সম্মানী পাবেন। ইমাম, পুরোহিত, বিহার অধ্যক্ষ ও যাজক বা পালকদের জন্য মাসিক ৫ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিন, সেবাইত, বিহার উপাধ্যক্ষ ও সহকারী যাজকদের জন্য ৩ হাজার টাকা এবং খাদেমদের জন্য মাসিক ২ হাজার টাকা সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এটি কোনো স্থায়ী বেতন বা ভাতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় বিশেষ সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এর ভিত্তিতে স্থায়ী সরকারি চাকরির দাবি করা যাবে না।

সম্মানী পাওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বৈধ নিয়োগপত্র থাকতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি আগে থেকেই সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, ট্রাস্ট বা বিদেশি অনুদান থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন, তারা এই সুবিধার আওতায় আসবেন না। তুলনামূলক কম আয়ের উপাসনালয় এবং প্রত্যন্ত বা দুর্যোগপ্রবণ এলাকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ প্রক্রিয়ায় অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

সুবিধা পেতে আগ্রহীদের নির্ধারিত ফরমে সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে এবং উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে আবেদন জমা দিতে হবে। আবেদনের সাথে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, ছবি, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, নিয়োগপত্র এবং নিজের নামের ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবের তথ্য দিতে হবে। যাচাই-বাছাই শেষে নির্বাচিতদের অর্থ সরাসরি ব্যাংক বা মোবাইল অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দেওয়া হবে। কোনো আবেদনকারী কমিটির সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হলে ৩০ দিনের মধ্যে পুনর্বিবেচনার আবেদন করার সুযোগও রাখা হয়েছে।

সরকারি এই উদ্যোগ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকারীদের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি সমাজের নৈতিক ভিত্তি ও আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতিকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কারা কত টাকা সম্মানী পাবেন

  • ইমাম, পুরোহিত, বিহার অধ্যক্ষ ও যাজক বা পালক: প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা।

  • মুয়াজ্জিন, সেবাইত, বিহার উপাধ্যক্ষ ও সহকারী যাজক বা পালক: প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা।

  • খাদেম: প্রতি মাসে ২ হাজার টাকা।

  • এটি কোনো স্থায়ী সরকারি বেতন বা ভাতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় বিশেষ সম্মানী হিসেবে গণ্য হবে।

আবেদনের যোগ্যতা ও শর্তাবলি

  • আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের স্থায়ী নাগরিক হতে হবে।

  • সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় উপাসনালয়ে দায়িত্ব পালনের বৈধ নিয়োগপত্র থাকা বাধ্যতামূলক।

  • যেসব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি আগে থেকেই সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, ট্রাস্ট বা কোনো বিদেশি সংস্থা থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা পান, তারা এই সুবিধার আওতায় আসবেন না।

  • কম আয়ের উপাসনালয় এবং প্রত্যন্ত বা দুর্যোগপ্রবণ এলাকার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

  • জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) স্পষ্ট ফটোকপি।

  • আবেদনকারীর ২ কপি পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি।

  • সর্বশেষ অর্জিত শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র।

  • উপাসনালয় পরিচালনা কমিটির দেওয়া আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র।

  • নিজের নামের ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা এমআইসিআর চেকের পাতার কপি (রাউটিং নম্বরসহ) অথবা নিজের এনআইডি দিয়ে খোলা ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব নম্বর।

আবেদন ও যাচাই প্রক্রিয়া

  • সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে এবং উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে নির্ধারিত ফরমে আবেদন জমা দিতে হবে।

  • সংশ্লিষ্ট কমিটি আবেদন ও কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে নির্বাচিতদের তথ্য কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করবে।

  • অর্থ বিভাগের আইবাস++ ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি সুবিধাভোগীর ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে টাকা পাঠানো হবে।

সম্মানী বাতিলের কারণসমূহ

  • নৈতিক স্খলন বা ফৌজদারি অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত হলে।

  • তথ্যে কোনো ধরনের জালিয়াতি প্রমাণিত হলে কিংবা চাকরিচ্যুত বা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে।

  • কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য হলে বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে।

  • সুবিধাভোগী মৃত্যুবরণ করলে এই সুবিধা বাতিল হয়ে যাবে।

আপিল ও অভিযোগের সুযোগ

  • কমিটির কোনো সিদ্ধান্তে আপত্তি থাকলে ফলাফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ইউএনও বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করা যাবে।

  • কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মধ্যে ওই অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে হবে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url