লাল মাটির পথে প্রথম পদচিহ্ন: অচেনা কুমিল্লায় জীবনের প্রথম দূরপাল্লার যাত্রা

সিলেটের ওসমানীনগরের কালাসারা দত্তগ্রামের শান্ত মেঠোপথ আর গোয়ালাবাজারের চেনা আলো-বাতাসেই কেটেছে আমার শৈশব ও কৈশোর। ঘরের চেনা মানুষ আর পরিচিত আঙিনার বাইরে বিশাল পৃথিবীর রূপ দেখার সুযোগ তখন পর্যন্ত খুব একটা হয়ে ওঠেনি। তাজপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর পর বুকের ভেতর একটাই তীব্র স্বপ্ন ডানা মেলতে শুরু করে—যেভাবেই হোক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে। কোনো বড় শহরের নামীদামী কোচিং সেন্টারের বাঁধানো পথে না হেঁটে নিজের তাগিদেই ঘরে বসে বইপত্র নিয়ে শুরু করি ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি। সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যেই ২০১৯ সালে জীবনে প্রথমবারের মতো নিজ জেলার সীমানা ছাড়িয়ে অচেনা এক শহরের উদ্দেশে পা বাড়ানো, যার প্রথম গন্তব্য ছিল লালমাই পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখক ও সাংবাদিক মন্টু দাশের স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে জীবনের প্রথম দূরপাল্লার ট্রেনযাত্রা এবং লাল মাটির কুমিল্লায় কাটানো এক অবিস্মরণীয় দিনের গল্প।
লেখক ও সাংবাদিক মন্টু দাশের স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে জীবনের প্রথম দূরপাল্লার ট্রেনযাত্রা এবং লাল মাটির কুমিল্লায় কাটানো এক অবিস্মরণীয় দিনের গল্প।

আমার সাথে ছিল সিলেটেরই আরও কয়েকজন বন্ধু। কিন্তু সফরের শুরুতেই এক অপ্রত্যাশিত ধাক্কা আমাদের স্তব্ধ করে দিল। পরীক্ষার আগের দিন রাতে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে দেখি আমাদের নির্ধারিত ট্রেনটি আগেই প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে গেছে। মুহূর্তের মধ্যে সবার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। পরদিন সকালে অচেনা এক শহরে জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা, অথচ হাতের প্রধান ভরসাটুকুই হাতছাড়া। কেউ বাসে যাওয়ার কথা বললেও আমরা রেলেই যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকলাম। স্টেশনের কাউন্টারে খোঁজ নিয়ে জানা গেল রাত ১টায় কুমিল্লার উদ্দেশে একটি লোকাল ট্রেন আসবে। মধ্যরাতের শুনশান স্টেশনের ঠান্ডা বাতাসে প্ল্যাটফর্মে পায়চারি করে পার করলাম দীর্ঘ দুই ঘণ্টার গভীর উদ্বেগ আর প্রতীক্ষা।

অবশেষে রাত ১টার ট্রেনটিতে যখন আমরা উঠলাম, তখন শুরু হলো আমার জীবনের প্রথম দূরপাল্লার রেলভ্রমণ। জানালার বাইরে রাতের গাঢ় অন্ধকার কেটে ঝকঝক শব্দে ছুটে চলছিল রেলগাড়ি। বগির ভেতরে আমরা বন্ধুরা ক্লান্তি ও উৎকণ্ঠা ভুলে মেতে উঠলাম প্রাণখোলা আড্ডা, ফেলে আসা স্মৃতি আর গানের সুরে। ভর্তি পরীক্ষার চাপা ভয় আর অচেনা শহরে পা রাখার উত্তেজনা মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াবী রাত কেটে গেল চলন্ত ট্রেনের দুলুনিতে।

ভর্তি পরীক্ষার অনিশ্চয়তা পেরিয়ে অচেনা শহরের রূপ দেখা, লালমাইয়ের প্রাঙ্গণে লেখক ও সাংবাদিক মন্টু দাশের স্মৃতিচারণমূলক ভ্রমণ কাহিনি।
ভর্তি পরীক্ষার অনিশ্চয়তা পেরিয়ে অচেনা শহরের রূপ দেখা, লালমাইয়ের প্রাঙ্গণে লেখক ও সাংবাদিক মন্টু দাশের স্মৃতিচারণমূলক ভ্রমণ কাহিনি।

সকাল ৯টায় যখন ট্রেনটি কুমিল্লা স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ছুঁল, তখন ভোরের নরম রোদ চারপাশ ভিজিয়ে দিয়েছে। হাতে কিছুটা সময় থাকায় মনে বেশ স্বস্তি এলো, কারণ পরীক্ষা ছিল দুপুর ১২টায়। দ্রুত কিছুটা সতেজ হয়ে আমরা ক্যাম্পাসের উদ্দেশে রওনা হলাম। লালমাই পাহাড়ের বুক চিরে গড়ে ওঠা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল মাটির পথ ধরে এগোতেই এক শান্ত ও মনকাড়া পরিবেশ আমাদের চোখ জুড়িয়ে দিল। ক্যাম্পাসের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল হাজার বছরের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী ময়নামতি ও শালবন বৌদ্ধ বিহার। পোড়ামাটির লালচে ইটের প্রাচীন দেয়াল, ভিক্ষুদের ধ্যানের শতবর্ষী ছোট ছোট কুঠুরি আর প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের গায়ে হাত ছোঁয়াতেই মনে হচ্ছিল যেন বহু শতাব্দীর পুরনো কোনো যুগে প্রবেশ করেছি। চারপাশের শালবনের নির্জনতা আর ইতিহাসের সেই গম্ভীর সৌন্দর্য পরীক্ষার আগের সবটুকু ক্লান্তি ও উৎকণ্ঠা এক নিমেষেই মুছে দিল।

চেনা আঙিনা ছেড়ে প্রথম অচেনাকে ছোঁয়ার গল্প, ময়নামতি ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সফরের দিনলিপি তুলে ধরেছেন লেখক ও সাংবাদিক মন্টু দাশ।
চেনা আঙিনা ছেড়ে প্রথম অচেনাকে ছোঁয়ার গল্প, ময়নামতি ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সফরের দিনলিপি তুলে ধরেছেন লেখক ও সাংবাদিক মন্টু দাশ।

দুপুর ১২টার পরীক্ষা শেষ হতে হতে বিকেল গড়িয়ে গেল। কিন্তু কেন্দ্র থেকে বের হতেই হঠাৎ চারপাশ অন্ধকার করে আকাশ ভেঙে নামল মুষলধারে বৃষ্টি। লালমাই পাহাড়ের ভিজে যাওয়া লাল কাদা আর প্রাচীন ইট থেকে ভেসে এলো এক অদ্ভুত সোঁদা মাটির গন্ধ, যা আজও আমার স্মৃতিতে সতেজ হয়ে আছে। বৃষ্টির তোড়ে বেশ কিছুক্ষণ আটকে থাকার পর চারপাশ ঢেকে সন্ধ্যা নেমে এলো। অবশেষে কাদাজল মাড়িয়ে বাস টার্মিনালে পৌঁছে রাতের বাসে চড়ে ক্লান্ত শরীরে রওনা দিলাম চিরচেনা সিলেটের পথে। এক অচেনা শহরের উদ্দেশ্যে ঘর ছাড়ার ভয়, রাতজাগা লোকাল ট্রেন, উৎকণ্ঠা, লাল মাটির প্রাচীন ইতিহাস, বৃষ্টির বিড়ম্বনা আর বন্ধুদের সাথে কাটানো অবিস্মরণীয় মুহূর্তগুলো শেষ পর্যন্ত সুস্থভাবে ঘরে ফেরার পরম স্বস্তিতে রূপ নিল। সেই দিনটি কেবল একটি ভর্তি পরীক্ষা ছিল না, ছিল বাইরের বিশাল পৃথিবীর সাথে আমার প্রথম পরিচয়ের এক চিরস্মরণীয় অধ্যায়।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url