সিলেটের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী: সুরমা তীরের ঐতিহাসিক আলী আমজদের ঘড়ি

বিশেষ প্রতিনিধি: সিলেটের সুরমা নদীর তীরে কীন ব্রিজের পাশেই স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে ঊনবিংশ শতকের অনন্য স্থাপত্যশৈলী ‘আলী আমজদের ঘড়ি’। প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে সিলেটের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঘড়িঘরটি আজও দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এক প্রধান আকর্ষণ।

সুরমা নদীর তীরে ঐতিহ্য ও ইতিহাসের স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা সিলেটে অবস্থিত শতবর্ষী ‘আলী আমজদের ঘড়ি’
সুরমা নদীর তীরে ঐতিহ্য ও ইতিহাসের স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা সিলেটে অবস্থিত শতবর্ষী ‘আলী আমজদের ঘড়ি’

ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, ১৮৭৪ সালে যখন সাধারণ মানুষের কাছে ঘড়ির অপ্রতুলতা ছিল, তখন সিলেটের কুলাউড়ার পৃত্থিমপাশার প্রখ্যাত জমিদার আলী আহমদ খান তাঁর ছেলে আলী আমজদের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে এই বিশালাকার ঘড়িঘরটি নির্মাণ করেন। সুউচ্চ গম্বুজ আকৃতির লোহার খুঁটি ও ঢেউটিন দিয়ে তৈরি এই স্থাপনাটির ডায়ামিটার আড়াই ফুট এবং ঘড়ির কাঁটা দুই ফুট লম্বা। সূচনালগ্ন থেকেই এটি পুরো সিলেট নগরীতে ‘আলী আমজদের ঘড়ি’ নামে পরিচিত লাভ করে।

দীর্ঘ ইতিহাস পরিক্রমায় নানা ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করতে হয়েছে এই প্রাচীন স্থাপনাকে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গোলার আঘাতে ঘড়িঘরটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাধীনতার পর তৎকালীন সিলেট পৌরসভা এটি মেরামতের উদ্যোগ নেয়। তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পরবর্তী সময়ে বহুবার এই ঘড়ির কাঁটা থমকে যায়।

পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে ঢাকার কারিগরদের সহায়তায় রিমোট কন্ট্রোল পদ্ধতি এবং পরবর্তীতে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতেও এটি সচল করার চেষ্টা করা হয়। অবশেষে ২০১১ সালে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের বিশেষ উদ্যোগে এটি পুর্ণাঙ্গভাবে মেরামত করা হয় এবং প্রাচীন এই স্মৃতিচিহ্নটি আবার সচল হয়ে ওঠে।

সিলেটের লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে এই ঘড়িটি এমনভাবে মিশে আছে যে একে কেন্দ্র করে একটি জনপ্রিয় প্রবাদ আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে—

“চাঁদনী ঘাটের সিঁড়ি, আলী আমজদের ঘড়ি, জিতু মিয়ার বাড়ি, বঙ্কু বাবুর দাড়ি।”

স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও সচেতন নগরবাসীর মতে, আলী আমজদের ঘড়ি কেবল একটি সময় মাপার যন্ত্র নয়; এটি সিলেটের কৃষ্টি ও প্রাচীন আভিজাত্যের প্রতীক। এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটিকে আরও সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে তা আগামী প্রজন্মের কাছে সিলেটের ইতিহাস তুলে ধরতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url